রবিবার, ২৬শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, রাত ১২:৩১

শিরোনাম :
বরিশালে বেতন চাইতেই শ্রমিকদের উপর গুলি কথা দিচ্ছি আপনাদের সেবায় আমি সর্বদা পাশে থাকবো : চেয়ারম্যান প্রার্থী এসএম জাকির হোসেন উপজেলার উন্নয়নে আপনাদের পাশে আমি সর্বদা রয়েছি -ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী জসিম উদ্দিন মোটরসাইকেল প্রতিকের চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থকদের ওপর হামলা, আহত-২ সদর উপজেলায় চেয়ারম্যান প্রার্থী হওয়া কে এই জাকির হোসেন প্রচার-প্রচারণায় ভোটারদের মন জয় করছেন ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী জসিম যারা আমার জন্য কাজ করেছে আমি তাদের রেখে কখনো পালিয়ে যাইনি-এসএম জাকির হোসেন রেমিটেন্স আহরণে রূপালী ব্যাংকের ২ দিন ব্যাপী ক্যাম্পেইন সম্পন্ন সদর উপজেলা নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী জসিম উদ্দিনের মনোনয়ন বৈধ ঘোষনা বরিশালের দুই উপজেলায় বৈধতা পেলেন ২৫ প্রার্থী

বরিশালে ‘সিন্ডিকেটে জিম্মি’ ব্রয়লারের বাজার

dynamic-sidebar

খবর বরিশাল ডেস্কঃ ষাটোর্ধ্ব রিকশাচালক আলতাফ। পাঁচজনের সংসারের ব্যয় নিজেকে জোগাড় করতে হয় রিকশা চালিয়ে। তবে, সর্বশেষ নিজের টাকায় মুরগি কিনে ঘরের সবাইকে নিয়ে কবে খেয়েছেন, তা বলতে পারেন না। মাঝে মাঝে খুব খেতে ইচ্ছা করে। কিন্তু বাজারদরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তার রিকশা ভাড়া জোটে না বিধায় ইচ্ছার কথাও ভুলে গেছেন। ব্রয়লার মুরগি যেন সোনার হরিণ!আলতাফ বলেন, আগে মুরগির দাম কম ছিল। কিনে খেতে পেরেছি।

 

 

দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন মুরগির ধারে কাছেও যেতে পারি না।তবে, কাউনিয়া প্রধান সড়কের রাজু পোল্টির ম্যানেজার শাহজালাল জানান, প্রায়ই আলতাফ এসে দরদাম করেন। তারপর চলে যান। ইচ্ছা থাকলেও হয়তো কেনার সামর্থ নেই তার। ২৪০ টাকা কেজিতে কতজনে কিনতে পারেন?খালেক মল্লিক নামে আরেকজন বলেন, ‘কবে যে আবার ব্রয়লার খাইতে পারমু হ্যার কোনো নিশ্চয়তা নাই।রূপাতলীর বাসিন্দা রাজমিস্ত্রি খলিলুর রহমান দুই মাস আগে ব্রয়লার মুরগির মাংস দিয়ে ভাত খেয়েছেন। মূল্যের উলম্ফনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এখন আর কিনতে পারছেন না। খলিলুর রহমান বলেন, আমি যে কয় টাকা রোজগার করি তাতে ব্রয়লার মুরগি কিনে খাওয়া মোটেই সম্ভব না।

 

 

এটা শুধু আলতাফ, খালেক বা খলিলুর রহমানের গল্প নয়, ভোক্তা পর্যায়ের অধিকাংশের অভিমত একই। সকলেই জানান, দামের উত্তাপে খাবার তালিকা থেকে বাদ পড়ছে ব্রয়লার।দাম বেড়ে যাওয়ায় শুধু ক্রেতা পর্যায়েই নয় বিক্রেতারাও রয়েছেন বিপাকে। সাত দিনের ব্যবধানে এক তৃতীয়াংশে নেমেছে ক্রেতা। ব্যবসায় ধস নেমেছে বরিশালের পোল্ট্রি ব্যবসায়ীদের। বন্ধ হয়ে গেছে অনেক খামার।ওদিকে বাজার মনিটরিং ও প্রাণিসম্পদ নিয়ে কাজ করা বড় দুটি প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না বাজার ব্যবস্থা। যে কারণে দিশেহারা ক্রেতা-বিক্রেতারা।

 

 

খামারিরা বলছেন, পোল্ট্রি খাদ্যের মূল্য বৃদ্ধি আর মুরগির বাচ্চা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সিন্ডিকেটের কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।বরিশাল জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. নূরুল আলম জানিয়েছেন, জেলায় ব্রয়লার, লেয়ার এবং সোনালি মুরগির খামার রয়েছে মোট ১ হাজার ৭৪৩টি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি খামার ব্রয়লার মুরগির ৮৪৩টি। যার ১১৩টি খামার সরকার নিবন্ধিত এবং ৬১৭টি অনিবন্ধিত। তবে কয়েকটি উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে এসবের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।কাউনিয়া এলাকার খামারি সেলিনা পারভীন বলেন, ১৬ বছর ধরে আমি ব্রয়লার মুরগির খামার চালাই।

 

 

স্বামী মারা যাওয়ার পরে মুরগির খামার করেই সংসার ধরে রেখেছি। তবে এক মাসের ব্যবধানে যে দাম বেড়েছে তাতে খামার বন্ধ করে দিতে হবে। এক মাস আগেও ১২ টাকা দামে প্রতি পিস মুরগির বাচ্চা কিনতাম। এখন তা এক লাফে ৬০ টাকা করা হয়েছে।তিনি জানান, একই সড়কে আরও তিনটি খামার রয়েছে। মুরগির বাচ্চার দামের কারণে কেউ নতুন করে বাচ্চা তোলেনি।তার দেওয়া তথ্য অনুসারে খোঁজ নিতে গিয়ে দেখা যায়, বড় আকৃতির ওই খামারগুলো বন্ধ করে রাখা হয়েছে। খামারি রাজু বলেন, প্রতি বস্তা খাবার এখন কিনতে হচ্ছে ৩ হাজার ৭০০ টাকায়। মুরগির বাচ্চার দাম বেড়েছে। এজন্য ঝুঁকি নেইনি। যদি বাচ্চা আর খাবারের দাম কমে তাহলে আবার খামার চালাবো।

 

 

চন্দ্রমোহন এলাকার খামারি হারুন খলিফা বলেন, এই এলাকায় মোট চারটি খামার ছিল। তিন মাস আগেও দাম সহনশীল থাকায় বাচ্চা উঠাতে পেরেছি। রমজানের আগে কিছু বাচ্চা তুলতে পারলে ব্যবসা হতো। কিন্তু উৎপাদন পর্যায়েই দাম টালমাটাল হওয়ায় খামার বন্ধ করে রেখেছি।বরিশাল নগরীর বাজার রোড, পোর্ট রোড, নতুন বাজার, চৌমাথা বাজার, রূপাতলী, নথুল্লাবাদ বাজার এবং শহরতলীর তালতলী বাজার, চরকাউয়া বাজার, মতাশার বাজার, কালিজিরা বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিটি বাজারের অধিকাংশ দোকানে স্বল্প সংখ্যক ব্রয়লার মুরগি আছে। এর অন্যতম কারণ দাম বৃদ্ধি। এসব দোকানে ব্রয়লার প্রতি কেজি ২৩৫ থেকে ২৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যদিও অধিকাংশ দোকানে মূল্য তালিকা প্রদর্শিত নেই।বাজার রোডের নাসির পোল্টি ফার্মের ব্যবসায়ী নাসির হোসেন বলেন, বাজারের কোনো স্থায়িত্ব নেই।

 

আজকে বিক্রি করছি ২৪০ টাকা পরের দিন বিক্রি করতে হচ্ছে আড়াই শ টাকায়। এর কারণ আসলে ব্যাখা করতে পারি না ক্রেতাদের কাছে। আমাদেরও আসলে করার কিছুই নেই। এজন্য ব্রয়লার মুরগি তোলা কমিয়ে দিয়েছি।রাজু পোল্ট্রির ম্যানেজার শাহজালাল বলেন, ব্রয়লার মুরগি কয়েক দিন ধরে চাহিদা মতো পাচ্ছি না। আর ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে ব্রয়লারের দাম। এজন্য ক্রেতাও কমে গেছে অনেক।দেশি মুরগির বিক্রেতা মোতাহার খান বলেন, দেশি মুরগি প্রতি কেজি ৫৫০ টাকা আর ব্রয়লার ২৪০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। ব্রয়লারের দাম যেভাবে বাড়ছে তাতে অল্পদিনেই দেশি মুরগির দাম ধরে ফেলবে। মূলত দাম বেড়ে যাওয়ায় ক্রেতা একেবারেই কমে গেছে।শিকারপুর পোল্ট্রির মালিক শেখ মো. ইউসুফ বলেন, একমাস আগেও ব্রয়লার মুরগির দাম ছিল ১২০ টাকা। তখনই বেশি দাম বলে ক্রেতা কিনতে চাইতো না।

 

 

এখন ২৪০ টাকা করা হয়েছে ব্রয়লারের দাম। এখনতো ক্রেতাই খুঁজে পাচ্ছি না।তিনি বলেন, আগে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হতো ব্রয়লার। এখন সবচেয়ে কম বিক্রি হয়। আমরা এখন দোকানের কর্মচারীর বেতন দিতে পারি না। দোকান বন্ধ করা ছাড়া উপায় নেই।ামারি ও ব্যবসায়ীরা দাবি করেছেন- রমজানকে টার্গেট করে ডিম ফুটিয়ে বাচ্চা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সিন্ডিকেট করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে।খামারি শাহীন মোল্লা বলেন, দেশে হাতে গোনা ৪-৫টি প্রতিষ্ঠান ডিম ফুটিয়ে বাচ্চা উৎপাদন করে। এসব প্রতিষ্ঠান প্রতি বছরই রমজানের আগে ডিম ফুটানো কমিয়ে দেয়। তারা রমজানকে টার্গেট করে সীমিত বাচ্চা ফুটাচ্ছে। এতে করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি মুরগি প্রজনন কেন্দ্র যদি বাচ্চা ফুটানোর পরিমাণ বাড়াতো তাহলে এই সংকট কেটে যেত। অথচ এই প্রতিষ্ঠান কোনো কাজেই আসছে না খামারিদের।ব্যবসায়ী আব্দুস শুক্কুর বলেন, বাচ্চা যারা ফুটান তারা ইচ্ছা করেই কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছেন। যে প্রতিষ্ঠান আগে দুই লাখ বাচ্চা ফুটাতো তারা এখন দিনে ২০ হাজার বাচ্চা ফুটাচ্ছে। এজন্য খামারিরা চাহিদা মতো বাচ্চা কিনতে পারছেন না।

 

 

দোকানেও চাহিদা মতো ব্রয়লার মুরগি পাচ্ছে না। অথচ ওইসব প্রতিষ্ঠান অল্প বাচ্চা ফুটিয়ে বেশি দামে বিক্রি করছে।তিনি বলেন, এক সপ্তাহ আগে প্রতি পিস বাচ্চার দাম ছিল ১৫ টাকা। তা এখন ৬০ টাকা। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর শুধু খুচরা বাজার মনিটরিং করলেই চলবে না এসব বড় বড় প্রতিষ্ঠানের কাছেও জানতে চাওয়া উচিত কেন রমজান এলে তারা বাচ্চা ফুটানো কমিয়ে দেন?বরিশালের জনপ্রিয় চটপটি বিক্রেতা সুলতান বলেন, আগে প্রতিদিন ৩০ কেজি ব্রয়লার মুরগির মাংস কিনতে হতো। এখন তা কিনতে পারছি না। ক্রেতারা এসে হতাশ হয়ে ফিরে যান। চটপটিতে মুরগি দিতে পারি না। বর্তমানে ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। ব্রয়লারের দাম সরকার নিয়ন্ত্রণে না আনলে হাজার হাজার মানুষ পথে বসে যাবে।মনিরা বেগম নামে এক ক্রেতা বলেন, কয়েক দিন আগে ব্রয়লার ১৮০ টাকা ছিল। তখন কিনতেই কষ্ট হতো। এখন ২৪০ টাকা করায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এত দাম বাড়ানো উচিত না। ব্রয়লারের দাম যদি এত বাড়ানো হয় তাহলে মানুষ খাবে কী? তিনি দ্রুত দাম কমানোর দাবি জানান।ভাতের হোম ডেলিভারি ব্যবসায়ী সবুজ বলেন, আগে সপ্তাহে পাঁচ দিন মুরগি দিতাম।

 

 

হঠাৎ করে দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন সপ্তাহে এক দিন দেই। তাতেও পোষায় না। ব্রয়লারের দাম এত থাকলে আমার ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে। মারাত্মক ঝুঁকিতে আছি ব্যবসা নিয়ে।প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের আওতায় পরিচালিত সরকারি মুরগি প্রজনন খামার কাজ করে ডিম ও মুরগির উৎপাদন বৃদ্ধি নিয়ে। এমনকি সরকার নির্ধারিত ১২ টাকা মূল্যে খামারিদের মুরগির বাচ্চা এবং ৬ টাকা মূল্যে প্রতি পিস ডিম বিক্রি করে থাকে। আর অসাধু ব্যবসা বন্ধে মাঠপর্যায়ে কাজ করে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। তবে ব্রয়লার মুরগির অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে দুটি দপ্তরের ভূমিকা নেই বলে মনে করেন না ক্রেতা, বিক্রেতা ও খামারিরা। এসব দপ্তরের কর্মকর্তারাও মনে করেন- কিছু সীমাবদ্ধতা দূর হলে পোল্ট্রির বাজারে যে সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে তা ভাঙা সম্ভব।বরিশাল জেলা সরকারি মুরগি প্রজনন ও খামার উন্নয়ন কার্যালয়ের পোল্ট্রি উন্নয়ন কর্মকর্তা আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, আমরা বাজার নিয়ন্ত্রনে প্রত্যক্ষভাবে ভূমিকা রাখতে পারি না।

 

 

তবে মুরগি প্রজনন কেন্দ্রে যত বেশি মুরগির বাচ্চা উৎপাদন সম্ভব খামারিরা তত বেশি ন্যায্যমূল্যে বাচ্চা পাবে। এতে করে বাচ্চা উৎপাদনে বাইরে যে সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে তা ভেঙে যাবে।এই কর্মকর্তা জানান, বরিশাল মুরগি প্রজনন ও খামার উন্নয়ন কেন্দ্রে অটো-ম্যানুয়াল যে মেশিনটি রয়েছে তাতে ৮০ হাজার ডিম ফুটানোর সক্ষমতা রয়েছে। এখানে যদি অটো মেশিন দেওয়া হয় তাহলে প্রতিবার দেড় লাখের বেশি ডিম ফুটানো সম্ভব। বেশি ডিম ফুটলে খামারিরা বেশি বাচ্চা পাবে। তখন বাজার কোনো সিন্ডিকেটের দখলে থাকবে বলে মনে হয় না।

 

 

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় উপ-পরিচালক অপূর্ব অধিকারী বলেন, বাজার নিয়ন্ত্রণে আমরা প্রতিদিনই বাজার মনিটরিং করছি। ব্রয়লার মুরগির দাম হঠাৎ বৃদ্ধি পেয়েছে। বরিশালের বড় বাজারগুলোতে আমরা কাজ শুরু করেছি, যেন কোনো দোকানি ক্রেতা ঠকিয়ে উচ্চ দামে মুরগি বিক্রি না করতে পারেন। এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আমরা দুটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেই তারা মূল্য তালিকা প্রদর্শন করছে কিনা এবং ক্রয়ের ভাউচার রসিদ সংরক্ষণ করছেন কিনা। সামনে রমজান, এক্ষেত্রে বাজার মনিটরিং আরও জোরদার করা হবে।

 

আমাদের ফেসবুক পাতা

© All rights reserved © 2018 DailykhoborBarisal24.com

Desing & Developed BY EngineerBD.Net